লকডাউন হোক টোব্যাকো কোম্পানি

304
0

বিশ্বে করোনা মহামারিতে প্রায় অচলঅবস্থা বিরাজ করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় থেকে ধূমপান ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। কারণ ধূমপান করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ঝুঁকিটা নিজেরা সহজেই ত্যাগ করতে পারেন। ধূমপানের পাশাপাশি অন্যান্য পানীয়ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এসব পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে বস্তুটি এত ক্ষতিকর, সেটার উৎপাদন কেন বন্ধ করা হচ্ছে না। সারাদেশ লকডাউন করে রাখা হচ্ছে, অথচ সিগারেট বিক্রি কেন লকডাউন করা হচ্ছে না।

দেখা গেছে, তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ ধুমপান করায় করোনাভাইরাসে তারা অধিক হারে আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার নারীদের তুলনায় পুরুষের আক্রান্তের হার অনেক বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগ গবেষণা কেন্দ্র- আইইডিসিআর প্রকাশিত এক ইনফোগ্রাফের তথ্য নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, তামাক সেবনকারীদের আক্রান্তের হার বেশি হওয়ার কারণ হলো তাদের ফুসফুস দুর্বল থাকে।

ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্র সংক্রান্ত অসুস্থতা বিশ্বব্যাপী অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গোটা বিশ্বে মৃত্যুর ৫টি শীর্ষস্থানীয় কারণের মধ্যে ২টিই ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্র সংক্রান্ত জটিলতা । তামাক ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপান ফুসফুসের যেসব রোগ হচ্ছে তার মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে ফুসফুসে ক্যান্সার, ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিস (সিওপিডি), যক্ষা এবং অ্যাজমা বা হাঁপানি অন্যতম।

প্রতি বছর তামাক ব্যবহারের ফলে বিশ্বে ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে আরো প্রায় ১০ লাখ মানুষ, যার বড় একটি অংশ শিশু। বাংলাদেশে অকাল মৃত্যু ঘটানোর ক্ষেত্রে তামাকের অবস্থান পঞ্চম। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতিবছর তামাকের কারণে মারা যাবে ১ কোটি মানুষ। এ মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশের বেশী সংঘটিত হবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। অর্থাৎ ৭০ লক্ষই অকাল মৃত্যুকে হবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে। এই মৃত্যুর বড় অংশই হবে ফুসফুস ক্যান্সার, সিওপিডি এবং যক্ষার মতো ব্যাধির দ্বারা। বাংলাদেশে তামাকজনিত মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। তামাক ব্যবহারজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার (বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, ২০১৮) মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। যা ওই সময়ে দেশে সকল মৃত্যুর ১৩.৫ শতাংশ।

তামাকজনিত রোগের ফলে মৃত্যের সংখ্যা ২০০৪ সালে ৫৭ হাজার জনের তুলনায় ২০১৮ সালের দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এখন আসা যাক করোনা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা যা বলা হয়েছে, সিগারেট, বিড়ি, ই-সিগারেট, সিসা, ভেপিং মানুষের দেহে ফুসফুস, হার্ট এবং দেহের অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল করে দেয়। তাই করোনা ভাইরাস সংক্রমনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। সেটা একজন অধূমপায়ীর তুলনায় ১৪ গুন বেশি। এছাড়াও এসব পণ্য হাতের মাধ্যমে মুখে ভাইরাস প্রবেশের মাধ্যমে সংক্রমনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের সময় বার বার থুতু ফেলার মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। এখন আসা যাক বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি ২২শে এপ্রিল পর্যন্ত করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ১০% এর বয়স ষাট বছরের বেশি। ৫১-৬০ বছরের মধ্যে ১৫%, ৪১-৫০ বছরের মধ্যে ১৮%, ৩১-৪০ বছরের মধ্যে ২২%, ২১-৩০ বছরের মধ্যে ২৪%, ১১-২০ বছরের মধ্যে ৮% এবং ১০ বা ১০ বছরের নিচে বয়সীদের মধ্যে ৩% ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত আক্রান্তে মধ্যে পুরুষ ৬৮ শতাংশ এবং নারী ৩২ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্তদের বয়স সীমা ২১ থেকে ৩০ বছর। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে ত্রিশ ও তদূর্ধ্ব ব্যক্তিদের মধ্যে হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসযন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, যক্ষা, ফুসফুসে ক্যান্সার, স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারে তামাকজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে । তামাক ব্যবহারকারীদের মধ্যে তামাকজনিত এই রোগগুলোর একটিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তামাক অ-ব্যবহারকারীদের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেশি এবং দেশে ত্রিশ ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৭০ লাখের অধিক লোক তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। এদের মধ্যে ১৫ লক্ষ লোকের (২২ শতাংশ) রোগাক্রান্ত হওয়ার সাথে তামাক ব্যবহারের প্রত্যক্ষ সংশ্লেষ রয়েছে।

তাছাড়া, ১৫ বছরের কম বয়সী ৪ লÿ ৩৫ হাজারেরও বেশি শিশু তামাকজনিত নানান রোগে ভুগছে, যাদের মধ্যে আবার ৬১ হাজারের অধিক (১৪ শতাংশ) শিশু বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। সুতরাং এই জনগোষ্ঠি নিশ্চই করোনাতে আক্রান্ত হলে ভাল থাকার কথা না কারণ তাদের ফুসফুস আগে থেকেই অসুস্থ। আগেই বলেছি গোটা বিশ্বে মৃত্যুর ৫টি শীর্ষস্থানীয় কারণের মধ্যে ২টিই ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্র সংক্রান্ত জটিলতা । সুতরাং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এখনই সময় তামাকের ব্যবহার পরিহার করা।

বর্তমান সময়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন রোধে সরকার গত ২৯ মার্চ থেকে সরকার সাধারন ছুটি ঘোষনা করায় সবধরনের শিল্প-কারখানা বন্ধ রয়েছে। আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি পোষাক শিল্প কারখানা বন্ধ আছে। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের এর চিঠির মাধ্যমে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও জাপান টোব্যাকো তাদের তামাক পাতা সংগ্রহ, উৎপাদন, বিপণন চালিয়ে যাচ্ছে। এর সাথে সাথে বিড়ি শ্রমিকদের দিয়ে বিড়ি কোম্পানিগুলো তাদের বিড়ি বানানো কাজ করে যাচ্ছে ।

কিছু সংশয় নিয়ে সামনের দিনগুলো চিন্তা করতে হচ্ছে তাহলো, যেহেতু সবাই এখন বাড়ীতে অবস্থানকালে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। আমরা নিজেরাও করোনাতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে নিজেরাতো থাকছি সাথে সাথে পরিবারে নতুন কোন সমস্যার জন্ম দিচ্ছি। বিশ্বে অনেক দেশে দেখা যায় করোনায় ধূমপায়ীদের মারা যাবার হার বেশি। আমরা কি বুঝি না এই মৃত্যু বিপনণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের কি পরিমান স্বাস্থ্যক্ষতি আগে থেকেই করছে এবং এই করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবের সময়ে কতটা ক্ষতি নিয়ে আসছে আমাদের জাতির জন্য। তাই সরকারের উচিত এই আত্মঘাতী নেশা দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

মো: মোখলেছুর রহমান
সহকারী পরিচালক ও প্রকল্প সমন্বয়কারী তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প
স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন