রোজিনাকে হেনস্তার এ টু জেড

109
0

দিনভর নাটকীয়তা শেষে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয়েছে। সরকারি নথির ছবি তোলার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতারের পর তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

সোমবার বেলা তিনটার দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিবের কক্ষে অবরুদ্ধ হন প্রথম আলোর এই জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি রাষ্ট্রীয় গোপন নথি চুরি করেছেন, যেগুলো প্রকাশ হলে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হবে। রাত ৯টার পরে রোজিনাকে সচিবালয় থেকে নেয়া হয় শাহবাগ থানায়। সেখানে লিপিবদ্ধ করা হয় মামলা। এই গণমাধ্যমকর্মীকে থানায় নেয়ার পর থেকেই সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখান বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিকরা। রাত ৩টার দিকেও তাদের অবস্থান অব্যাহত ছিল।

সচিবালয়ে বন্দি : সোমবার (১৭ মে) দুপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান। সেখানে তার সঙ্গে সোর্সের দেখা হয়। দেখা হওয়ার পর সোর্স কিছু ডকুমেন্ট দেয়। ডকুমেন্ট পাওয়ার পর রোজিনা স্বাস্থ্য সচিবের রুমের বাইরে অপেক্ষমাণ কনস্টেবল মিজানের ভেতরে কেউ আছেন কি-না জানতে চাইলে মিজান বলেন, ভেতরে কেউ নেই। আপনি ভেতরে গিয়ে বসেন।রোজিনা বলেন, আমি ভেতরে যাব না। আমি কিছু তথ্যের জন্য এসেছিলাম। তারপর মিজান বলেন, আপনি রুমের ভেতর বসেন। স্যার এখনি চলে আসবেন। এ কথা বলে মিজান রুমের ভেতরে বসায়। কক্ষে বসে তিনি পত্রিকা পড়ছিলেন। ওই সময় কনস্টেবল মিজানসহ আরও কয়েকজন তার ব্যাগ কেড়ে নেয়। তারা হুমকি দিয়ে বলেন, এতদিন অনেক নিউজ ও লেখালেখি করেছেন, আপনাকে মাটির মধ্যে পুঁতে ফেলব। পরে তাকে ছয়-সাত ঘণ্টা সচিবালয়ে আটকে রাখা হয়। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সেখানে উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরা চিকিৎসার কথা বলেন। বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে রোজিনাকে চিকিৎসা দেয়ার কথা বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের বাইরে এনে নিচে নামিয়ে পুলিশের গাড়ি করে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৫ ঘণ্টার বেশি সময় তাকে আটকে রেখে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ বিষয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা একটি ইংরেজি দৈনিকের সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদ রোমিও বলেন, ‘আমরা সচিবালয়ে গিয়ে রোজিনাকে একটি কক্ষে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসে।’

এ ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিকেরা সোমবার সচিবালয় ও শাহবাগ থানার সামনে বিক্ষোভ করেন। এর নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংগঠন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য রোজিনা ইসলামের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি আছে। এমন একজন সাংবাদিককে হেনস্তা করা অন্যায়, অনভিপ্রেত। কী কারণে তাকে আটকে রাখা হয়েছে বিষয়টির তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’

সচিবালয় থেকে শাহবাগ থানা : রোজিনার বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া মোবাইল ফোনে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথির ছবি তোলা এবং আরও কিছু নথি লুকিয়ে রাখার অভিযোগ আনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তারা এ বিষয়ে শাহবাগ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিব ডা. মো. শিব্বির আহমেদ উসমানী এ মামলা দায়ের করেন। এরপর শাহবাগ থানা পুলিশ সোমবার (১৭ মে) রাত ৯টার দিকে তাকে সচিবালয় থেকে থানায় নিয়ে আসে ও তাকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে রাখা হয়।

সোমবার (১৭ মে) রাত সাড়ে ১০টার দিকে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মামুন অর রশীদের কক্ষের সামনে অবস্থান নেন অর্ধশতাধিক সাংবাদিক। এ সময় তারা সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে মুক্তির দাবি জানান। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন তারা। উপস্থিত সাংবাদিকরা বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত রোজিনাকে পুলিশের হেফাজত থেকে ছাড়া না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ওসির কক্ষের সামনে থেকে অবস্থান ছাড়বেন না তারা।

শাহবাগ থেকে আদালতপাড়া : রাতভর শাহবাগ থানায় রেখে মঙ্গলবার (১৮ মে) সকাল সাড়ে ৭টায় রোজিনাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে নেয়া হয়। রোজিনা ইসলামের স্বামী মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সকাল ৮টার দিকে রোজিনাকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। শাহবাগ থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) আরিফুর রহমান সরদার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। বিচারক রিমান্ড মঞ্জুর না করে রোজিনা ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। শেষে রিমান্ড নামঞ্জুর করে রোজিনাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু এ তথ্য নিশ্চিত করেন। আগামী ২০ মে রোজিনা ইসলামের জামিন শুনানি হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শাহবাগ থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) আরিফুর রহমান সরদার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। বিচারক রিমান্ড মঞ্জুর করেননি। তিনি সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।’আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের জামিনের আবেদন করেন। অপরদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক রিমান্ড নামঞ্জুর করেন।

 ‘৬২ পাতার নথি’ সরানোর অভিযোগ : অফিশিয়াল সিক্রেক্টস অ্যাক্টে করা মামলায় সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে ৬২ পৃষ্ঠার নথি সরানোর অভিযোগ করা হয়েছে। মামলার এজাহারের জব্দ তালিকায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের একান্ত সচিবের কক্ষ থেকে চুরি হওয়া ৬২ পৃষ্ঠার নথি উদ্ধার দেখানো হয়েছে।

জব্দ তালিকায় সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন সেট (যার একটি স্যামসাং গ্যালাক্সি জি এস টোয়েন্টি আলট্রা লাইট, আরেকটি আইফোন সেভেন প্লাস) ও দুটি পিআইডি কার্ড জব্দমূলে উদ্ধার দেখিয়ে মঙ্গলবার সকালে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

নথি নিয়ে রমনা জোনের উপকমিশনার (ডিসি) সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘এটি পুলিশের দেখার বিষয় না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যারা দিয়েছেন, তাদের বিষয়। তারা সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে, মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছে, পরে আবার তাদের জিম্মায় নিয়ে গেছে উদ্ধার হওয়া নথিগুলো। আদালত চাইলে তারা আবার দিতে বাধ্য থাকবেন।’৬২ পাতার নথি কী বিষয়ক, জানতে চাইলে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এটা পড়ে দেখিনি। এটা আমরা বুঝবও না। আসলেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার মতো তথ্য আছে কি না, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।’

মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, এই গণমাধ্যমকর্মী রাষ্ট্রীয় কিছু গোপন নথি সরিয়েছেন; কিছু নথির ছবি তুলেছেন। এগুলো প্রকাশ হলে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট হতে পারত। নথিগুলো ছিল টিকা ক্রয়-সংক্রান্ত। অভিযোগে বলা হয়, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের টিকা ক্রয়-সংক্রান্ত আলোচনা চলছে। এর খসড়া সমঝোতা স্মারক ও নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট প্রণয়নকাজ চলছে। সমঝোতা স্মারক নিয়ে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত পত্র ও ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ হচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সন্নিবেশিত।

আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে  :‘আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।’ রিমান্ড শুনানি শেষে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় এভাবেই সাংবাদিকদের কাছে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন রোজিনা ইসলাম। সকালে রিমান্ড শুনানিতে কোনো সাংবাদিককে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। ‘কোন আইনে ঢুকতে দেয়া হয়নি’ প্রশ্ন করা হলে পুলিশের সঙ্গে সাংবাদিকদের কয়েকবার বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়। শুনানি শেষে আদালত থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা রোজিনাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কিছু বলার আছে কি না?’ উত্তরে রোজিনা বলেন, ‘আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, আমার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়ে রিপোর্ট করায় আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।’একথা বলার সাথেই তাকে সরিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় পুলিশ ‘কথা বলা যাবে না, কথা বলা যাবে না’ বলে তাকে সরিয়ে নেয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলন বয়কট : রোজিনা ইসলামকে হেনস্থার প্রতিবাদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলন বয়কট করেছেন সাংবাদিকরা। এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) কাজী জেবুন্নেছা বেগমের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের ৩ কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন করতে আসেন। এসময় বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএসআরএফ) সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ বলেন, রোজিনা ইসলামকে হেনস্থা করার প্রতিবাদে আমরা এ সংবাদ সম্মেলন বয়কট করলাম। এরপর কাজী জেবুন্নেছা বেগম ও মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মাইদুল ইসলাম প্রধান সাংবাদিকদের সংবাদ সম্মেলন বয়কট করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার অনুরোধ জানান। তাদের অনুরোধে সাড়া না দিয়ে সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন উপস্থিত সাংবাদিকরা।

আদালত থেকে কারাগার : মঙ্গলবার (১৮ মে) বেলা পৌনে ৩টার দিকে একটি প্রিজনভ্যানে করে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে কাশিমপুর কারাগারে আনা হয়। পেছনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ পাহারায় ছিল। এর আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিমের আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আগামী ২০ মে তার জামিন শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। কাশিমপুর কারাগার সূত্র জানায়, রোজিনা ইসলামকে বেলা পৌনে ৩টার দিকে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ সময় কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে রোজিনা ইসলামের স্বামী মনিরুল ইসলাম মিঠু ও নিকট আত্মীয়দের দেখা যায়। রোজিনার স্বামী মনিরুল ইসলাম মিঠু বলেন, রোজিনা ইসলামের শারীরিক অবস্থা ভালো না। তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।

প্রথম আলোর সংবাদ সম্মেলন: রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় তিনি আক্রোশের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে প্রথম আলো। এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি চুরির অভিযোগ এনে মামলা ও গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে শাহবাগ থানায় যান দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকটির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা।

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে রোজিনা ইসলাম এই মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু রিপোর্ট করছিলেন। যার মধ্যে নিয়োগ-সংক্রান্ত দুর্নীতির রিপোর্ট ছিল। আমরা মনে করছি, এতে তিনি মন্ত্রণালয়ের আক্রোশের শিকার হয়ে থাকতে পারেন।’সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সমাধানের দিকে যাব এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যা যা করণীয় করা হবে।’

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, ‘রোজিনা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেছেন। এগুলো সরকারকে সাহায্য করে। এটা নিয়ন্ত্রণ করলে দুর্নীতি যারা করে, তারা উৎসাহিত হবে।’এ গণমাধ্যমকর্মীকে গ্রেপ্তারের সমালোচনা করে আনিসুল হক বলেন, ‘রোজিনার শিশুসন্তান রয়েছে এবং তার নিজের শারীরিক অবস্থাও ভালো না। তিনি আজ কোভিডের টিকা নিয়েছেন। রাষ্ট্র মানবিক না হলে তার চেয়ে দুঃখজনক কিছু থাকে না।’

১১ বিশিষ্ট নাগরিকের ক্ষোভ : রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের ১১ বিশিষ্ট নাগরিক। তাঁরা রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করে অবিলম্বে তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রোজিনা ইসলামের আক্রান্ত হওয়ার কারণ তলিয়ে দেখা ও হামলাকারীদের চিহ্নিত করে তাঁদের কর্মকাণ্ডের তদন্ত করার দাবি জানান।

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকেরা এ দাবি জানান। বিবৃতিদাতারা হলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, অনুপম সেন, রামেন্দু মজুমদার, সারোয়ার আলী, মফিদুল হক, মামুনুর রশীদ, মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবীর, আবদুস সেলিম ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তাঁরা বলেন, ‘আমরা মনে করি, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করে অবিলম্বে তাঁর মুক্তিলাভে সরকার বিবেচকের ভূমিকা পালন করবেন। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা, সরকারের ঘোষিত এই দুই নীতির সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাস্যকর বক্তব্য : সচিবালয়ে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে শারীরিকভাবে নির্যাতন বা আঘাত করা হয়নি বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বরং রোজিনার বিরুদ্ধেই এক কর্মকর্তাকে ‘খামচি ও থাপ্পড়’দেয়ার হাস্যকর অভিযোগ তুলেছেন তিনি। মঙ্গলবার অর্থনৈতিক পরিষদের সভা শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে ঘটনাটির বিষয়ে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

মন্ত্রী জানান, তিনি নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তবে ‘অবহিত’হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, “একজন নারী খালি কক্ষে প্রবেশ করে ‘রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট’নিয়ে যাচ্ছিলেন, ছবি তুলছিলেন। তখন তাকে আটক করা হয়। ঘটনার সময় সেখানে একজন সিনিয়র অফিসার, একজন অতিরিক্ত সচিব এবং দুজন উপ-সচিব প্রথমে ব্যাপারটি ডিল করেছেন। পরবর্তীকালে যখন স্টেট সিক্রেটসের (রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা) বিষয় এসেছে, তখন পুলিশকে ডাকা হয়। তারা তাকে নিতে পারছিল না, বের করতে পারছিল না। এটা নিয়েই অনেক সময় গেছে। এটিই আমাকে বলা হয়েছে।’

রোজিনার গলা চেপে ধরার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখবো। তবে ওই অতিরিক্ত সচিব জানিয়েছেন, তিনি তাকে (রোজিনাকে) ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট (আক্রমণ) করেননি। বরং উনি (রোজিনা ইসলাম) তার গায়ে খামচি দিয়েছেন, থাপ্পড় দিয়েছেন। পরে যখন এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বাহাস হবে, তখন সত্য ঘটনা বেরিয়ে আসবে। কোনো নির্দোষ লোক সাজা পাক, এটা আমরা চাই না। কারণ আপনারাও দেশের কাজ করেন আমরাও দেশের কাজ করি। এমন কিছু করবো না, যাতে দেশের ক্ষতি হয়ে যায়। দেশের মানুষের ক্ষতি হয়ে যায়, সরকারের ক্ষতি হয়ে যায়।’

মামলার বাদী উপসচিবের ডেস্ক বদল : দৈনিক প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস আইনে করা মামলার বাদী স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিবের ডেস্ক বদল করা হয়েছে।বাদী উপসচিব ডা. মো. শিব্বির আহমেদ ওসমানীকে জনস্বাস্থ্য-১ অধিশাখা থেকে জনস্বাস্থ্য-২ অধিশাখায় বদলি করে সোমবার (১৭ মে) জারি করা অফিস আদেশটি মঙ্গলবার (১৮ মে) প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। একই আদেশে আরও পাঁচ উপসচিবের ডেস্ক বদল করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি: সচিবালয়ে দৈনিক প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা করার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এ তদন্ত কমিটি গঠন করে । কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম-সচিব (উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাইফুল্লাহিল আজমকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপসচিব (প্রশাসন-২ শাখা) মো. আবদুছ সালাম ও উপসচিব (জনস্বাস্থ্য-১) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে।

###