যুক্তরাষ্ট্রে রোজিনার মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ

76
0

যুক্তরাষ্ট্র থেকে তোফাজ্জল লিটন: সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের উপর হামলা, হেনস্থা ও মামলার প্রতিবাদে এবং তাঁর মুত্তির দাবিতে যুক্তরাষ্টের  প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়েছে। নিউইয়র্ক নগরীরর জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় এ প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্টিত হয় ১৮ মে মঙ্গলবার  বিকেল বেলা । সমাবেশে নিউইয়র্ক সহ আশেপাশের নগরী থেকে লেখক, সাংবাদিক এবং জনসমাজের প্রতিনিধিরা যোগ দেন।

সাংবাদিক রোজিনার এই নিপিরনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার কণ্ঠ চেপে ধরার প্রয়াসের নগ্ন বাস্তবতা উঠে এসেছে। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছে। রোজিনা ইসলামকে যারা হেনস্তা করেছে , তাদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসতে হবে ও তাদের বিচার করতে হবে। অনতিবিলম্বে রোজিনা ইসলামকে মুক্তি দিতে হবে। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে বলে বক্তরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানান।

ডাইভারসিটি প্লাজার সমাবেশে বাংলা ও ইংরেজিতে হাতে লেখা পোস্টার নিয়ে চল্লিশ জনের অধিক মানুষ  সমবেত হলেবেশ অন্যান্য দেশেল সচেতন  লোকজনকেও সংহতি জানাতে দেখা যায়। নট্যকার ও সাংবাদিক তোফাজ্জল লিটনের সঞ্চালনায় প্রতিবাদ সমাবেশের শুরুতেই বক্তব্য রাখেন প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার আবাসিক সম্পাদক, লেখক-সাংবাদিক ইব্রাহীম চৌধুরী। দেশের একজন সাংবাদিকের উপর নিপীড়নের প্রতিবাদে দেশে ও  প্রবাসী জনসমাজের প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিবাদে নেমে আসার জন্য তিনি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

প্রবীণ সাংবাদিক , সাপ্তাহিক পরিচয় পত্রিকার সম্পাদক নাজমুল আহসান বলেছেন , ওয়াশিংটন পোস্ট সহ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে রোজিনা ইসলামকে গ্রেফতার ও হেনস্তা করা নিয়ে যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে , তা দেশের ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করেছে। এ নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে এবং রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা ও হয়রানি করার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবী জানান।

আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোহম্মদ সাঈদ বলেন, গনতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ বাকস্বাধিনতা। আজকে আমদের টুটি চেপে ধরা হচ্ছে। প্রবাসী সাংবাদিকদের মতো দেশের সাংবাদিকরা যদি এখিনি সংঘবন্ধ ন হন তাহলে এমন ঘটনার বারংবার দেখা দিবে।

বাংলদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী শেখ আখতারুজ্জামান তাঁর বক্তৃতায় বলেন , রোজিনা ইসলামের নামে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে তার সারমর্ম দেখলেই ধারনা পাওয়া যায় এ মামলা বিদ্বেষপ্রসূত। এ মামলার কোন ভিত্তি নেই।  বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট সুব্রত বিশ্বাস বলেন , স্বাধীন বাংলাদেশে একের এক এমন ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে আজ সত্য জানার এবং জানানোর সব পথ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।

চলচ্চিত্র নির্মাতা রওশন আরা নিপা বলেন, আমলাতন্ত্রের একজন কর্মচারি যেভাবে একজন সাংবাদিকের উপর শারিরিক নির্যাতন করেছে তা নেক্কার জনক। সরকার তাদের শবকত হাতে দমন না করলে দেশের গনতন্ত্র নস্যাত হবে।

সাংবাদিক মনিজা রহমান রহমান বলেন , রোজিনা আমাদের সহকর্মিই শুধু নয়, আজ সারা বাংলাদেশের সব সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম হয়ে উঠেছে। তাঁর উপর হামলা মানে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার উপর হামলা ।

লেখক রওশন হক বলেন , রোজিনা ইসলামকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের চিহ্নিত লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

ডাইভার্সিটি প্লাজার সমাবেশে কিছুক্ষণ পরপর রোজিনা ইসলামে মুক্তির দাবীতে স্লোগান দেয়া হয়। অবিলম্বে মুক্তি দেয়া না হলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে লেখক সাংবাদিক ও জনসমাজের প্রতিনিধিরা তাদের বক্তৃতায় উল্লেখ করেন। প্রতিবাদ সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন, লেখক সাংবাদিক শামিম আল আমীন , সাপ্তাহিক বর্ণমালা সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, এফ এফ এম মিসবাউজ্জামান, নিহার সিদ্দিকী, শহীদুল ইসলাম , শাখাওয়াত হোসেন সেলিম, এম বি তুষার , এইচ বি রিতা ,  গোপাল স্যান্যাল,  বিশ্বজিত সাহা , রোকেয়া দীপা ,  মনজুরুল হক, শিরিল হাসান, জাকির হোসেন বাচ্চু, শামীম আহমেদ, আব্দুশ শহীদ , ইমাম কাজী কাইয়্যুম প্রমুখ।

উল্লেখ করা যেতে পারে, গত সোমবার বেলা তিনটা থেকে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে নানাভাবে হেনস্তা করা হয় সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে। এ সময় তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলে। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। লুটিয়ে পড়েন মেঝেতে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তাঁর তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি। রাত সাড়ে আটটার পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শাহবাগ থানায়। সেখানে প্রায় ১১ ঘণ্টা পুলিশি হেফাজতে ছিলেন রোজিনা ইসলাম। এর মধ্যেই থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা দেওয়া হয়।

আদালত কক্ষ থেকে হাজতখানায় নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের রোজিনা ইসলাম বলেন, ‘আমার সঙ্গে অন্যায় আচরণ হচ্ছে
মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটায় থানা থেকে বের করে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে নিয়ে যাওয়া হয় আদালতের হাজতখানায়। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা ছিলেন তিনি। পরে এজলাসে নেওয়া হয়। শুনানি চলে প্রায় ৪০ মিনিট। শুনানি শেষে আবার হাজতখানায় নেওয়া হয় তাঁকে। এর আধা ঘণ্টা পর প্রিজন ভ্যানে করে তাঁকে আদালত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরের কাশিমপুরের মহিলা কারাগারে নেওয়া হয়। প্রিজন ভ্যান যখন কারাগারের ফটকে পৌঁছায়, তখন সময় বেলা ২টা ৪০ মিনিট। সোমবার থেকে শুরু হওয়া হেনস্তা, হয়রানি আর নির্যাতনের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে কারাগারে নিতে পেরিয়ে যায় প্রায় ২৩ ঘণ্টা।

এজলাস কক্ষে দুই পক্ষের আইনজীবীরা থাকলেও বেশির ভাগ গণমাধ্যমের কর্মীকে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত কক্ষ থেকে হাজতখানায় নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের দেখে রোজিনা ইসলাম বলেন, ‘আমার সঙ্গে অন্যায় আচরণ হচ্ছে।’ রোজিনা ইসলামকে গতকাল সকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে শাহবাগ থানা-পুলিশ। এর বিরোধিতা করেন তাঁর আইনজীবীরা। শুনানি নিয়ে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে রোজিনাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামীকাল বৃহস্পতিবার তাঁর জামিন আবেদনের ওপর অধিকতর শুনানির দিন ধার্য করেন। এ ছাড়া তাঁকে কারাবিধি অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ারও আদেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৫ জুলাই দিন ঠিক করেছেন আদালত।