মোটরসাইকেলের সাতকাহন

399
0

বাজাজ
দেশের মোটরসাইকেলের বাজারে সবচেয়ে বেশি হিস্যা ভারতের বাজাজ ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের। বাংলাদেশে এই ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাজারজাত করে উত্তরা মোটরস লিমিটেড, যার চেয়ারম্যান মতিউর রহমান।

উত্তরা মোটরস যাত্রা শুরু করে ১৯৭২ সালে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন মতিউর রহমানের বড় ভাই প্রয়াত মোখলেসুর রহমান। ১৯৮৫ সালের দিকে উত্তরা মোটরস বাজাজের মোটরসাইকেল বাংলাদেশে আনা শুরু করে।

এখন দেশেই বাজাজের মোটরসাইকেল উৎপাদিত হচ্ছে। ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে উত্তরা মোটরস সাভারের জিরানিতে তাদের নতুন কারখানায় মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করে। সেখানে এখন তিনটি জনপ্রিয় মডেল বাজাজ পালসার, ডিসকভার ও প্লাটিনা উৎপাদিত হচ্ছে। শিগগিরই শুরু হবে সিটি ১০০ ও ডিসকভার ১১০ মডেলের মোটরসাইকেলের উৎপাদন।

জিরানিতে বাজাজের কারখানাটির নাম ট্রান্স এশিয়া ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এতে কাজ পেয়েছেন প্রায় ৪৮০ জন। উত্তরা মোটরস বাজাজের মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা ছাড়াও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বাণিজ্যিক যানবাহন, গাড়ি ও টায়ার বাজারজাত করে। এ ছাড়া তাদের নানা ব্যবসা রয়েছে।

ভারতে বাজাজের প্রতিষ্ঠা ১৯২৬ সালে। বাজাজের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটি ভারতের সেরা ১০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটি। বিশ্বে তিন চাকা ও দুই চাকার যানবাহন উৎপাদনে তারা চতুর্থ।

টিভিএস
বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারের হিস্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে ভারতীয় ব্র্যান্ড টিভিএস। দেশে টিভিএস ব্র্যান্ডের বাজারজাত করে সনি-র‌্যাংগস গ্রুপ।

এখন দেশেই মোটরসাইকেল উৎপাদন করছে টিভিএস। সনি-র‌্যাংগসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রিয়ান মোটরস ও ভারতের টিভিএস অ্যান্ড সন্সের যৌথ উদ্যোগের কোম্পানির নাম টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেড। তাদের কারখানা গাজীপুরের টঙ্গীতে।

ভারতীয় এই ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশে বাজারজাত করছে দেশীয় সনি-র‍্যাংগস গ্রুপ। টিভিএস অটো বাংলাদেশ জানায়, টিভিএসের মূল প্রতিষ্ঠান টিভিএস অ্যান্ড সন্স ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টিভিএস ভারতের তৃতীয় শীর্ষ দুই চাকার যান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তারা ১৫ হাজার কোটি রুপির পণ্য বিক্রি করেছে।

একসময় জাপানের সুজুকির সঙ্গে ভারতে যৌথ উদ্যোগের কারখানা ছিল টিভিএসের। পরে সুজুকি আলাদা হয়ে যায়।

টিভিএস অটো বাংলাদেশের বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক আশরাফুল হাসান বলেন, বিগত কয়েক বছরে সরকার করছাড় ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে মোটরসাইকেল শিল্প গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে। এর সুফল পেয়েছে দেশের মানুষ। তবে চলতি বাজেটে মূল্য সংযোজন করের (মূসক/ভ্যাট) কারণে চাপ তৈরি হয়েছে।

হিরো
ভারতের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিরো মোটোকর্পের হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলও বাংলাদেশে জনপ্রিয়। এ দেশে হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাজারজাত করে নিলয় মোটরস, যেটি নিটল-নিলয় গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে হিরোই বাংলাদেশে সবার আগে উৎপাদন শুরু করে। নিটল-নিলয় গ্রুপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে কারখানা করেছে হিরো মোটোকর্প। কারখানাটি যশোরে, যেটি বছরে দেড় লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদন করতে সক্ষম। কোম্পানির নাম এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড।

ভারতে হিরো আগে সাইকেল উৎপাদন করত। ১৯৮৪ সালে জাপানের হোন্ডা মোটর করপোরেশন হিরোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মোটরসাইকেল উৎপাদনের কারখানা করে। তাদের ব্র্যান্ড নাম ছিল হিরো-হোন্ডা। ২০১০ সালে হোন্ডা অংশীদারত্ব বিক্রি করে দেয়, যা কিনে নেয় হিরো। এরপর তারা নিজেরাই হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাজারজাত শুরু করে। হিরোর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোটরসাইকেল বাজারে তাদের হিস্যা সবচেয়ে বেশি।

এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা বিজয় কুমার মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কারখানা ২০১৭ সালের জুনে যাত্রা শুরু করে। বিদেশি ব্র্যান্ডের মধ্যে তাঁরাই এ দেশে কারখানা করেছেন। এ কোম্পানিতে মোট বিনিয়োগ ৩২৫ কোটি টাকা। আর কারখানায় হিরোর অংশীদারত্ব ৫৫ শতাংশ, বাকিটা নিলয়ের।

হোন্ডা
জাপানের হোন্ডা মোটর করপোরেশন বাংলাদেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরুর পর এ দেশে তাদের ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় বেসরকারি আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনে ২৫ একর জমিতে হোন্ডা বাংলাদেশ লিমিটেডের (বিএইচএল) কারখানা যাত্রা শুরু করে গত বছরের নভেম্বর মাসে।

এ কারখানায় আপাতত বছরে এক লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করেছে হোন্ডা, যা ২০২১ সালে দুই লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

বিশ্বের ১৬০টি দেশে ব্যবসা করে হোন্ডা মোটর করপোরেশন। এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ১০টি দেশে তাদের কারখানা রয়েছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের পর বাংলাদেশে কারখানা করেছে হোন্ডা।

হোন্ডা কারখানাটি করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল শিল্প সংস্থার (বিএসইসি) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে। নতুন কারখানায় হোন্ডার বিনিয়োগ ১৯০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আর বিএসইসির বিনিয়োগ ১০৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। ভবিষ্যতে মোট বিনিয়োগ বেড়ে ৬৮০ কোটিতে উন্নীত হবে। কর্মসংস্থান হবে দুই হাজার মানুষের।

বিএইচএলের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশিকুর রহমান বলেন, কারখানা ও প্রধান কার্যালয় মিলিয়ে হোন্ডায় কাজ পেয়েছেন প্রায় ৪৫০ জন। দেশে উৎপাদনের ফলে হোন্ডা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের দাম কমেছে। ক্রেতাদের কাছে সহজলভ্য হয়েছে।

ইয়ামাহা
বাংলাদেশেই জাপানের সুপরিচিত ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল সংযোজনের কারখানা করেছে এসিআই মোটরস। শুধু সংযোজন নয়, একই কারখানায় ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনের প্রস্তুতিও চলছে।

এসিআই কারখানাটি করেছে গাজীপুরের শ্রীপুরে। কারখানার জমির মোট পরিমাণ ৬ একর। এসিআই বাংলাদেশে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের একমাত্র পরিবেশক। কারখানাটি করতে এসিআইকে কারিগরি সহায়তাও দিচ্ছে ইয়ামাহা। জানতে চাইলে এসিআই মোটরসের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, ইয়ামাহা এই প্রথম কোনো প্রতিষ্ঠানকে তাদের মোটরসাইকেল উৎপাদনের কারখানা করতে দিয়েছে। ২০১৬ সালে এসিআই যখন ইয়ামাহার পরিবেশক হিসেবে দায়িত্ব পায়, তার আগে দেশে বছরে ছয় হাজারের মতো ইয়ামাহা মোটরসাইকেল বিক্রি হতো। এ বছর সেটা ২৫ হাজার ছাড়াবে বলে আশা করছে এসিআই।

ইয়ামাহা মোটর করপোরেশন ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত। কোম্পানিটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে তাদের মোট বিক্রির পরিমাণ ১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি জাপানি ইয়েন, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মোট আয়ের ৬১ শতাংশ আসে মোটরসাইকেল ও এর যন্ত্রাংশ বিক্রি করে।

সুব্রত রঞ্জন দাস আরও বলেন, সম্প্রতি তাঁরা একটি জরিপ করে দেখেছেন, সিংহভাগ মানুষের পছন্দ ইয়ামাহা মোটরসাইকেল। দাম নাগালে এলে তারা ইয়ামাহাই কিনবে।

সুজুকি
মোটরসাইকেলের আরেকটি জনপ্রিয় জাপানি ব্র্যান্ড সুজুকিও উৎপাদিত হয় বাংলাদেশেই। এ দেশে সুজুকির পরিবেশ কর‌্যানকন মোটর বাইক লিমিটেড (আরএমবিএল)। সুজুকি ও র‌্যানকন মিলে গাজীপুরে কারখানা করেছে।

নিজেদের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, র‌্যানকন মোটর বাইক ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে। তখন তাদের কর্মী ছিল মাত্র তিনজন। সুজুকির মোটরসাইকেলের প্রথম চালানটি দেশে আসার আগেই অগ্রিম বিক্রি হয়ে যায়। ২০১৮ সালে আরএমবিএলের কর্মী সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯০ জনে, বাজারে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডে পরিণত হয় সুজুকি।

সুজুকি মোটর করপোরেশন জাপানের বহুজাতিক ব্র্যান্ড। তারা মোটরসাইকেল ছাড়াও গাড়ি ও নানা ধরনের ইঞ্জিন তৈরি করে। এটি ১৯০৯ সালে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালে সুজুকি প্রথম মোটরযুক্ত বাইসাইকেল তৈরি করে।

সুজুকি বাংলাদেশ ও র‌্যানকন মোটরবাইক জানিয়েছে, বাংলাদেশে তাদের কারখানায় জমির পরিমাণ ৩৭ একর। এটি দেশের সবচেয়ে বড় মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী কারখানা। এতে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ করা হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা।

সুজুকি বাংলাদেশ ও র‌্যানকন মোটরবাইক আরও জানায়, তাদের কোম্পানিতে এখন দেড় হাজারের মতো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এটা প্রত্যক্ষ ও পরো হিসাব। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে। কোম্পানিটি ভবিষ্যতে ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

রানার
দেশীয় ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের মধ্যে একমাত্র নাম রানার। ২০১২ সালে রানার অটোমোবাইলস রানার ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বাজারজাত শুরু করে। ময়মনসিংহের ভালুকায় নিজস্ব কারখানায় এ কোম্পানি মোটরসাইকেল উৎপাদন করছে।

রানার বিভিন্ন ইঞ্জিন ক্ষমতার মোটরসাইকেল তৈরি করে। দেশের বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বর্তমানে নেপাল ও ভুটানে রপ্তানি হচ্ছে রানারের মোটরসাইকেল। এ ছাড়া তারা শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করছে।

দেশে প্রথমবারের মতো ১৬৫ থেকে ৫০০ সিসির (ইঞ্জিন ক্ষমতা) মোটরসাইকেল উৎপাদনের অনুমোদন পায় রানার। গত বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের এ অনুমোদন দেয়।

মোটরসাইকেল বাজারে রানারের যাত্রা ২০০০ সালে। ওই বছর তারা আমদানি করা মোটরসাইকেল দেশে বাজারজাত করতে শুরু করে। কয়েক বছর পর প্রতিষ্ঠানটি মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ সংযোজন শুরু করে। ২০০৭ সালে ময়মনসিংহের ভালুকায় দেশে প্রথম মোটরসাইকেলের বিভিন্ন অংশ বা কম্পোনেন্ট তৈরির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করে। পূর্ণাঙ্গ মোটরসাইকেল তৈরির কারখানা হিসেবে রানারের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। এখন তারা ১৪টি মডেলের মোটরসাইকেল তৈরি করছে।

রানার জানায়, তাদের মোটরসাইকেল কারখানায় মোট বিনিয়োগ ৪০০ কোটি টাকার মতো। রানার অটোমোবাইলে কর্মীর সংখ্যা ১ হাজার ২০০–এর মতো।

সুত্রঃ প্রথম আলো