মহামারী কোভিড-১৯ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা

114
0

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সারা বিশ্বে কোভিড – ১৯’কে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে গত বছরের প্রথমভাগে। বাংলাদেশ তার বাইরে নয় এবং গত ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে জুন ২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে এবং সারা দেশের মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে থাকার জন্য অনুরোধ করে। তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এই পদক্ষেপ সারা বিশ্বেই গ্রহণ করা হয়েছিলো। এতে মানুষের জীবন কিছুটা হলেও বিপদমুক্ত হয়েছে বটে কিন্তু দেশের চলমান অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকী সামাজিক জীবনে এর ক্ষতিকর প্রভাব মারাত্মকভাবে লক্ষনীয়। এই প্রভাব বহুমাত্রিক, আর এই বহুমাত্রিক প্রভাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
·অধিকতর অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছে শহরকেন্দ্রিক অনিশ্চিত ক্ষুদ্র ব্যবসা বা কাজের সাথে জড়িত মানুষের জীবন ও জীবিকা
·শারীরিক অসহায়ত্ব
·সামাজিক বিপর্যয় (বাল্য বিবাহ, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা)
·সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা
আমি আমার এ লেখায় প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষ করে নিরাপদ গর্ভধারন, প্রসব এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে আলোকপাত করবো। কেননা, বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী করোনাকালে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে অল্প বয়সে গর্ভধারন, গর্ভপাত এবং অনিরাপদ সন্তান প্রসবের বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। উপর্যুপরি, ইতিহাস বলে যে, এই ধরনের অবস্থার পরপরই গর্ভধারন, বাচ্চা প্রসবের সংখ্যা এবং অনাকাক্সিখত গর্ভধারন ও অনিরাপদ গর্ভপাতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং এটি একটি সাধারন প্রবণতা। তাই সঙ্গত কারনেই মহামারীর প্রথম থেকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহযোগীতায় মেরী স্টোপস বাংলাদেশের কাজ ছিলো নিরাপদ মাতৃত্ব, সন্তান ধারন, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার এবং এই সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মসূচী এবং তথ্যসেবাসমূহ নিশ্চিত করা।
এই ভয়াবহ মহামারী কালীন সময়ে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সব সরকারি এবং অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ এ পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আপ্রাণ কাজ করে আসছে। যদিও প্রথমদিকে সার্বিকভাবে মাতৃস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিলো। ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর অপ্রতুলতা, ব্যবহারে অনভ্যস্ততা এবং ভীতির কারণে সরকারী এবং বেসরকরী সেবাকেন্দ্রসমূহ খোলা থাকলেও সেবাগ্রহীতারা চাহিদামাফিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ সব বিষয় বিবেচনায় এনে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহযোগীতায় এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থার মতামতের ভিত্তিতে মেরী স্টোপস বাংলাদেশ ’কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারীর সময়ে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অত্যাবশ্যকীয় প্রজনন, মা, নবজাতক, শিশু ও কিশোর-কিশোরী সেবা বিষয়ক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরী করে যা সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থার ব্যবহারের জন্যে অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত হয়।
পাশাপাশি এই বিপদকালীন সময়ে বাল্যবিয়ে এবং নারীর প্রতি সহিংসতার হার বৃদ্ধির কারনে ও কিশোর কিশোরীদের বয়:সন্ধিকালে পৃথক পৃথক শারীরিক ও মানসিক চাহিদা বিবেচনায় এনে তথ্য এবং সেবা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, করোনা পরবর্তীকালে একটা খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেছেন। ইতিমধ্যে, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রতিটি খালি জায়গায় শাক্-সব্জির গাছ লাগানো সহ অন্যান্য ফসল ফলানোর জন্য সকলকে ডাক দিয়েছেন। এ আহ্বানের মর্ম আমাদের অবশ্যই অনুধাবন করে কাজ করতে হবে।
আমরা মনে করি, পরিবার পরিকল্পনা হচ্ছে একটি জরুরি সেবা যার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের স্বাস্থ্য, উন্নয়ন এবং কল্যাণ। এটি কোন বিচ্ছিন্ন সেবা নয় এবং এই কর্মসূচী অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই, বিশেষ করে এই বিশ্ব মহামারীর সময়ে এর প্রতি আলোকপাত করে কাজ করা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে পারিবারিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে, বিলম্বিত গর্ভধারণ এবং জীবনের সাথে জড়িত অন্যান্য বিষয়ে কাজ করে যেতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের এসডিজি গোল অর্জনে, মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারী এবং বেসরকারী সকল সংস্থাসমূহকে আন্তরিকতার সাথে একযোগে কাজ করে যেতে হবে, এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
মনজুন নাহার
লীড, এ্যডভোকেসি এন্ড কমিউনিকেশন
মেরী স্টোপস বাংলাদেশ