বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে ক্ষতির মুখে পোশাক শিল্প

365
0

বন্ডেড সুবিধায় বিনাশুল্কে কাপড় আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করছে ব্যবসায়ীদের অসাধু একটি চক্র। আর এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সুতা ও কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবৈধভাবে বিদেশি কাপড় দেশে আসায় ধ্বংসের পথে দেশীয় শিল্প। এই শিল্প রক্ষায় সরকারকে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ‘বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বড় একটা জায়গা দখল করে রয়েছে।বাংলাদেশের এই খাতে বিশ্ববাজারের অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার।কিন্তু অবৈধভাবে বিদেশি কাপড় দেশে আসায় ধ্বংসের পথে দেশীয় শিল্প। আমরা দীর্ঘ দিন ধরে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছি। বিদেশি কাপড় যদি অবৈধ পথে না আসতো তাহলে আমাদের দেশীয় শিল্প চাঙ্গা থাকতো। বাংলাদেশে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চোরাই পথে দেশে ঢুকছে’।

তিনি আরও বলেন, ‘মূলত দুটি পথে অবৈধভাবে বিদেশি কাপড় বাংলাদেশে ঢুকছে। এর একটি হচ্ছে বন্ডের মিসডিক্লিয়ারেন্স ও ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যম; আরেকটি সীমান্ত হাটের নামে। বাংলাদেশের সব মার্কেট এখন বিদেশি কাপড়ে সয়লাব। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বা এনবিআরের কাছে কমার্শিয়াল আমদানির তথ্য চাওয়া হলে তারা সেটা কাউকে দিতে পারবে না। এমনকি বৈধভাবে কি পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হচ্ছে সে তথ্যও তাদের কাছে নেই। তাহলে বাজারে এত কাপড় কীভাবে আসছে? সেটাও কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন। প্রশ্নের উত্তর একটাই- অবশ্যই অবৈধভাবে এইসব কাপড় দেশে ঢুকছে’।

মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ‍‘বাজারে যদি তিন বিলিয়ন ডলারের কাপড় অবৈধভাবে প্রবেশ করে তাহলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। কাপড় আমদানিতে কর্মাশিয়াল ট্যাক্স সাড়ে ৩৭ শতাংশ। যদি চোরাই পথে এক বিলিয়ন ডলারের কাপড় ঢোকে তাহলে সরকার সাড়ে ৩৭ শতাংশ রাজস্ব হারাচ্ছে। এ রকম তিন বিলিয়ন ডলারের কাপড় অবৈধভাবে বাজারে এনে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের শিল্পগুলো বন্ধ হচ্ছে। যার কারণে ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগ হারাচ্ছে। আর দিনদিন উদ্যোক্তরা ব্যাংকের কাছে ঋণখেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। এমনকি ব্যাংকও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে দেশের বড় একটি অংশ বেকার হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বন্ডেড সুবিধায় এনে অবৈধভাবে বিক্রি করা কাপড় ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে। কিন্তু ঢাকা বন্ড কমিশনারেটের যে জনবল, তা দিয়ে এই ব্যবস্থা বন্ধ করা সম্ভব নয়। সেজন্য এনবিআরের জনবলকে কাজে লাগাতে হবে।তাহলেই এর সুফল পাওয়া যাবে।
বিজ্ঞাপন

এদিকে জানা গেছে, অসাধু কয়েকজন কাপড় ব্যবসায়ী কাপড় আমদানির পর সেগুলো পোশাক কারখানায় বিক্রি না করে খোলাবাজারে বিক্রি করছে। ফলে রফতানির মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীরা শতশত কোটি টাকা হাতিয়েও নিচ্ছে। আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছেন। ফলে বাজারের সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রে জানা গেছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া কিছু বন্ডেড পণ্য সম্প্রতি ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অভিযানে আটকও হয়েছে। গত রাজধানীর পুরান ঢাকার ইসলামপুরে ৩টি অভিযানে প্রায় ২০ কোটি টাকার বন্ডেড পণ্য জব্দ করা হয়েছে।এর বিপরীতে ৩টি ফৌজদারি মামলাও করেছে সংস্থাটি। শুধু তাই নয় ফৌজদারি মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারও করেছে।

এদিকে চলতি মাসে ৩টি অভিযানে ২৬৪ মেট্রিক টন বন্ডেড পণ্য আটক করেছে ঢাকা কাস্টম বন্ড কমিশনারেট। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পযর্ন্ত মোট ১৯৯টি অভিযানে সংস্থাটি ৭৯টি ট্রাক, ৭টি গুদাম সিলগালা ও ১১৩টি বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই মামলায় রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ২১৮ কোটি টাকা।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অধীনে মোট সক্রিয় লাইসেন্স ৩ হাজার ৮৩০টি। নিষ্ক্রিয় লাইসেন্স রয়েছে ২ হাজার ৯৮৩টি আর মোট বন্ড লাইসেন্স রয়েছে ৬ হাজার ৮১৩টি। বিভিন্ন সময়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের অভিযান, প্রিভেনটিভ অভিযান ও নিরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বন্ড অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকি উৎঘাটিত হয়। সেই মোতাবেক অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ড লাইসেন্স সাসপেন্ড ও বিন লক করে দেয় ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। ফলে এসব লাইসেন্স ব্যবহার করে আর কেউ বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি-রফতানি করতে পারে না। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে শুনানি গ্রহণ শেষে লাইসেন্স চুড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার মো. আল-আমিন বলেন, ‘বন্ডের অপব্যবহার রোধ, রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ এবং দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি।এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে’।