ঘামে ভেজা স্বপ্ন ভাসছে পানিতে

267
0

রাজধানীর মিরপুরের রুপনগর বস্তিতে ৩ হাজার টাকায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতেন রোজিনা বেগম। তিনি বাসা বাড়িতে কাজ করেন। তার স্বামী হাসান আলী আনারস বিক্রেতা। ৫ বছরের শিশু কন্যা মারজিয়াকে নিয়ে তাদের সুখের সংসার।

প্রতিদিনের মতো বুধবার সকালে মিরপুর ৬ নাম্বার বাজারের পাশের একটি বাসায় কাজে যান রোজিনা। ঘর মোছার সময় টেলিভিশনে তাদের বস্তির পাশের ভবনগুলো দেখতে পান। যার পাশে জ্বলছে আগুন।

ঘরেতো মারজিয়া আছে ওর কি হবে চিন্তা করতে করতে দৌড়ে যতোক্ষণে এসেছেন ততোক্ষণে তার ঘরের অস্তিত্ব নেই। পাগলের মতো খুঁজে বুকের ধন মারজিয়াকে পেলেও আগুনের ধ্বংসস্তুপে কিছু খুজে পাননি। তবুও ঘরের কাছে দাড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে বেঁচে থাকার সব স্বপ্ন পুড়ে কয়লা হয়ে ভাসতে দেখছেন ঝিলের পানিতে।

শুধু রোজিনা নয় খাম ঝড়ানো কষ্টের টাকায় তিলেতিলে গড়ে তোলা সবকিছুই হারিয়েছে বস্তির বেশিরভাগ মানুষ। তাদের ঠাঁই এখন খোলা আকাশের নিচে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রূপনগরের বস্তিতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরো বস্তি রুপ নিয়েছে ধ্বংসস্তূপে। কেউ কেউ হাত দিয়ে শেষ সম্বল কিছু পাওয়া যায় কিনা সেটা হাতরাচ্ছে। কেউবা মাথা চাপড়িয়ে ঝড়াচ্ছে চোখের জ্বল। অন্য সবারই চোখে মুখে বোবা কান্নার স্পষ্ট ছাপ। পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন সেটাই এখন বড় চিন্তা তাদের কাছে।

ইসলামিয়া হাই স্কুলের মাঠে আশ্রয় নেয়া আসমা আক্তার নামে বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, ৫ হাজার টাকায় দুই ঘর নিয়ে ভাড়া থাকি। বাসাবাড়িতে কাজ করি। পঙ্গু স্বামী ভ্যানে ফেরি করে পান-সিগারেট বিক্রি করেন। স্বামী আর এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, গত সাত মাস আগে বেঁচে থাকার অনেক আশা নিয়ে ভোলার পশ্চিম ইলিশা এলাকা ছেড়ে বস্তিতে ঠাঁই নিয়েছিলাম। কিন্তু এখানেই সব হারালাম।

এদিকে, রুপনগরের এ বস্তিতে আগুন লাগার কারন নিয়ে রহস্য দেখা দিয়েছে। বস্তিবাসির অভিযোগ ২০১৯ সালের আগষ্টে রুপনগর থানার পেছনের অংশের বস্তিতে বড় ধরনের অগ্নিকান্ড হয়। এরপর ৩ মাস আগে বস্তির চারপাশে লাগানো হয় ৪/৫টি বড় সাইনবোর্ড। তাতে লেখা আছে ‘ফ্ল্যাট প্রকল্পের নির্ধারিত স্থান, বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ।’

এই সাইনবোর্ডগুলো লাগানোর আগে রূপনগর বস্তির অন্তত ২০টিরও বেশি ঘর ভেঙে ফেলা হয়। ভাঙতে আসা লোকজন বলেছিল ‘এটা সরকারি জায়গা। এখানে ঘরগুলো বানিয়েছে কারা? এখানে কেউ ঢুকতে পারবে না। এরপর গত বুধবার সেখানে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলো। তাদের দাবি, বস্তিবাসিকে উচ্ছেদ করতে পরিকল্পিতভাবে এ আগুন দেয়া হয়েছে। যদিও এ ঘটনায় অগ্নিকান্ডের কারন জানতে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস।

বস্তিতে ২০টি ঘরের মালিক ইমন জানান, ‘আমার জন্ম এই বস্তিতে। গতবছর রুপনগর থানার পেছনের অংশে আগুন লাগার পর আমাদের মনে হয়েছিল এই বস্তিতেও আগুন লাগিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করে দেওয়া হবে। আমরা বারবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছি। বলেছি, আমাদের উচ্ছেদ করে দিলে বলে দেন। আমরা চলে যাবো। কিন্তু আমাদের আগুনে পুড়িয়ে নিঃস্ব করবেন না। যা ভাবছিলাম তাই হলো।

জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার জানান, এটি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সম্পত্তি। এখানে এখনও কোনও ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গৃহায়নের পক্ষ থেকে সংস্থাটির সদস্য (প্রকৌশল) এসএম ফজলুল কবীরকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের কারণসহ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো।

বুধবার সকাল ৯টার দিকে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিটের সাড়ে ৩ ঘন্টার চেষ্টায় বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বস্তির মোট ঘর সংখ্যা ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ঘরের সংখ্যা জানা না গেলেও স্থানীয় প্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জানান, ১০ হাজারের বেশি ঘর ছিল রূপনগরের এই বস্তিতে, যার মধ্যে ৭ হাজার পুড়ে গেছে।